অজ্ঞান হয়ে গেলে কোন ডাক্তার দেখাবো — কী করবেন
সতর্কতা: এই লেখাটি সাধারণ তথ্যের জন্য, চিকিৎসা পরামর্শ নয়। আপনার অবস্থা বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে বিএমডিসি-নিবন্ধিত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। কেউ অজ্ঞান হয়ে গেলে দেরি না করে ৯৯৯-এ কল করুন বা কাছের হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান।
কেউ অজ্ঞান হয়ে গেলে প্রথম কাজ চিকিৎসকের নাম খোঁজা নয় — প্রথম কাজ দ্রুত জরুরি সাহায্য পাওয়া। সোজা উত্তর হলো — অজ্ঞান হওয়া ব্যক্তিকে নিরাপদ জায়গায় শুইয়ে দিন, আশপাশে ভিড় করতে দেবেন না, আর দেরি না করে ৯৯৯-এ কল করুন বা জরুরি বিভাগে নিয়ে যান। জ্ঞান ফিরে আসার পর কারণ জানতে সাধারণত মেডিসিন বিশেষজ্ঞের কাছে যান, আর প্রয়োজনে তিনি হৃদ্রোগ বা স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠিয়ে দেবেন। এই লেখায় আপনি জানবেন অজ্ঞান হয়ে গেলে কী করা উচিত, কী করা উচিত নয়, কখন কোন বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন এবং কোন লক্ষণগুলো জরুরি।
অজ্ঞান হয়ে গেলে কোন ডাক্তার দেখাবেন
অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বলতে হঠাৎ করে জ্ঞান হারিয়ে ফেলা বোঝায় — ব্যক্তি ডাকলে সাড়া দেন না, চোখ খোলেন না, কিছু সময়ের জন্য আশপাশের কিছু বুঝতে পারেন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অল্প সময়ের মধ্যেই জ্ঞান ফিরে আসে, তবে জ্ঞান ফিরে এলেও বিষয়টাকে হালকা করে দেখা ঠিক নয়।
জ্ঞান ফিরে আসার পর কারণ জানতে শুরুতে মেডিসিন বিশেষজ্ঞের কাছে যাওয়াই ঠিক হয়। তিনি ঘটনার বিবরণ, আগে কোনো রোগ ছিল কিনা এবং সঙ্গে আর কী লক্ষণ ছিল, তা শুনে পরবর্তী করণীয় ঠিক করে দেবেন। কোন রোগের জন্য সাধারণভাবে কোন ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত, তা নিয়ে আমাদের কোন রোগের জন্য কোন ডাক্তার দেখাবো গাইডটিও দেখে নিতে পারেন।
কখন কোন বিশেষজ্ঞের কাছে যাবেন
প্রথমবার অজ্ঞান হলে — মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
আগে কখনো এমন হয়নি, হঠাৎ একবার অজ্ঞান হয়ে গেছেন — এমন ক্ষেত্রে শুরুতে মেডিসিন বিশেষজ্ঞের কাছে যান। তিনি ঘটনার বিস্তারিত শুনে বুঝতে পারেন সমস্যাটা কোন দিকে, এবং প্রয়োজনে সঠিক বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠিয়ে দেন।
হৃদ্যন্ত্রের সন্দেহ হলে — হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞ
অজ্ঞান হওয়ার আগে বুকে চাপ, বুক ধড়ফড় করা, শ্বাসকষ্ট বা ব্যায়ামের সময় অজ্ঞান হয়ে যাওয়া — এমন লক্ষণ থাকলে বিষয়টা হৃদ্যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত হতে পারে। এই ক্ষেত্রে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান, প্রয়োজনে তিনি হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞের কাছে পাঠিয়ে দেবেন।
মাথায় আঘাত বা খিঁচুনির সঙ্গে অজ্ঞান হলে — নিউরোলজি
পড়ে গিয়ে মাথায় আঘাত লেগে অজ্ঞান হয়ে গেলে, বা অজ্ঞান হওয়ার সঙ্গে হাত-পা শক্ত হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি, মুখ দিয়ে ফেনা ওঠা বা জিভ কেটে যাওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে বিষয়টা স্নায়ুর সঙ্গে জড়িত হতে পারে। এই ক্ষেত্রে প্রথমে জরুরি বিভাগে যান, তারপর চিকিৎসক প্রয়োজনে নিউরোলজিস্টের কাছে পাঠিয়ে দেবেন। মাথার সমস্যা নিয়ে বিস্তারিত জানতে আমাদের মাথার সমস্যায় কখন কোন ডাক্তার দেখাবেন লেখাটি পড়তে পারেন।
জ্বর বা দুর্বলতার সঙ্গে অজ্ঞান হলে — মেডিসিন বিশেষজ্ঞ
জ্বরের সঙ্গে অজ্ঞান হয়ে গেলে, বা অনেকদিনের দুর্বলতার পর অজ্ঞান হয়ে গেলে শুরুতে মেডিসিন বিশেষজ্ঞের কাছে যান। জ্বর নিয়ে বিস্তারিত জানতে আমাদের জ্বর হলে কোন ডাক্তার দেখাবো লেখাটি, আর দুর্বলতা নিয়ে জানতে শরীর দুর্বল হলে কোন ডাক্তার দেখাবো লেখাটি পড়তে পারেন।
শিশুর অজ্ঞান হয়ে গেলে — শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ
শিশুরা অনেক সময় নিজের কষ্ট ঠিকমতো বোঝাতে পারে না। শিশু অজ্ঞান হয়ে গেলে দেরি না করে জরুরি বিভাগে যান, তারপর শিশুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে যান। বড়দের জন্য দেওয়া সাধারণ পরামর্শ শিশুর ক্ষেত্রে একইভাবে প্রযোজ্য নয়।
গর্ভাবস্থায় অজ্ঞান হয়ে গেলে — দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান
গর্ভাবস্থায় অজ্ঞান হয়ে গেলে বিষয়টাকে কখনোই হালকা করে দেখবেন না। সঙ্গে মাথাব্যথা, চোখে ঝাপসা দেখা বা পেটে ব্যথা থাকলে দেরি না করে জরুরি বিভাগে যান। গর্ভাবস্থার নিয়মিত চিকিৎসককে ঘটনাটা অবশ্যই জানাবেন।
অজ্ঞান হওয়া কেমন হতে পারে
অজ্ঞান হওয়া সব সময় এক রকম হয় না। কেউ হঠাৎ করেই পড়ে যান, কেউ অজ্ঞান হওয়ার আগে মাথা ঘোরা, চোখে ঝাপসা দেখা, কানে ভোঁ ভোঁ শব্দ, ঘাম বা বমি ভাবের মতো আগের সংকেত পান। কেউ অল্প সময়ের মধ্যে জ্ঞান ফিরে পান, কেউ কিছুটা সময় নেন। কেউ জ্ঞান ফিরে পাওয়ার পর স্বাভাবিক মনে হলেও বিভ্রান্ত থাকেন।
একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখুন — অজ্ঞান হয়ে যাওয়া আর ঘুমিয়ে পড়া এক কথা নয়। ঘুমন্ত ব্যক্তিকে ডাকলে বা নাড়া দিলে সাড়া পাওয়া যায়, আর অজ্ঞান ব্যক্তি ডাকলেও সাড়া দেন না।

সতর্ক লক্ষণ: কখন দেরি করবেন না
নিচের লক্ষণগুলোর যেকোনোটি থাকলে ঘরে বসে অপেক্ষা করা ঠিক নয়। দ্রুত ৯৯৯-এ কল করুন বা কাছের হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যান।
- অজ্ঞান হওয়ার পর শ্বাস না চলা, বা শ্বাস নিতে কষ্ট
- অজ্ঞান হওয়ার সঙ্গে খিঁচুনি, মুখ দিয়ে ফেনা ওঠা বা জিভ কেটে যাওয়া
- মাথায় আঘাত লেগে অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, বা মাথা থেকে রক্ত পড়া
- বুকে চাপ, বুক ধড়ফড় করা বা তীব্র শ্বাসকষ্ট
- জ্ঞান ফিরে না আসা, বা বারবার অজ্ঞান হয়ে যাওয়া
- অজ্ঞান হওয়ার সঙ্গে শরীরের এক পাশে দুর্বলতা বা কথা জড়িয়ে যাওয়া
- গর্ভাবস্থায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, সঙ্গে মাথাব্যথা বা চোখে ঝাপসা দেখা
- শিশুর অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, সঙ্গে জ্বর বা খিঁচুনি
ডাক্তারের কাছে যাওয়ার আগে যা প্রস্তুত রাখবেন
চিকিৎসকের কাছে গেলে তিনি কয়েকটি বিষয় জানতে চান। আগে থেকে গুছিয়ে রাখলে আপনার কথা বলা সহজ হবে।
- অজ্ঞান হওয়ার ঘটনা কখন ঘটেছে, কতক্ষণ অজ্ঞান ছিলেন, আগে কখনো এমন হয়েছে কিনা
- অজ্ঞান হওয়ার আগে কী করছিলেন — দাঁড়িয়ে, বসে, হাঁটছিলেন, নাকি ঘুম থেকে উঠেছিলেন
- অজ্ঞান হওয়ার আগে কোনো আগের সংকেত ছিল কিনা — মাথা ঘোরা, চোখে ঝাপসা দেখা, ঘাম, বমি ভাব
- সঙ্গে জ্বর, বুকে চাপ, শ্বাসকষ্ট, খিঁচুনি বা মাথায় আঘাত ছিল কিনা
- আপনার আগে থেকে কোনো রোগ আছে কিনা — যেমন হৃদ্যন্ত্র, স্নায়ু, ডায়াবেটিস বা রক্তচাপের সমস্যা
- অজ্ঞান হওয়ার সময় আশপাশে কেউ ছিলেন কিনা, তারা কী দেখেছেন
- শিশুর ক্ষেত্রে বয়স, খাওয়া-দাওয়া, ঘুম ও জ্বরের তথ্য
- গর্ভাবস্থা থাকলে সেটা অবশ্যই জানান
এসব তথ্য সঙ্গে নিয়ে গেলে চিকিৎসক দ্রুত পরামর্শ দিতে পারেন।
অজ্ঞান হয়ে গেলে করণীয়
প্রথম কাজ হলো ঠান্ডা মাথায় দ্রুত জরুরি সাহায্য ডাকা। কেউ অজ্ঞান হয়ে গেলে ৯৯৯-এ কল করুন বা কাছের হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যাওয়ার ব্যবস্থা করুন। একা একা সামলানোর চেষ্টা করবেন না — আশপাশের কাউকে সাহায্যের জন্য ডাকুন।
দ্বিতীয় কাজ হলো অজ্ঞান হওয়া ব্যক্তিকে নিরাপদ জায়গায় রাখা। তাকে মাটিতে শুইয়ে দিন, মাথার নিচে শক্ত কিছু রাখবেন না, গলার কাছে জামা ঢিলে করে দিন, আশপাশে ভিড় করতে দেবেন না। শ্বাস চলছে কিনা খেয়াল রাখুন।
তৃতীয় কাজ হলো যা করা উচিত নয়, তা এড়িয়ে চলা। অজ্ঞান হওয়া ব্যক্তিকে জোর করে তুলে বসাবেন না, ঝাঁকাবেন না, মুখে পানি বা খাবার দেবেন না, আর গালে চড় মারবেন না। এসব করলে উল্টো ক্ষতি হতে পারে। জ্ঞান ফিরে এলেও তাড়াহুড়ো করে উঠতে দেবেন না — কিছু সময় শুয়ে বিশ্রাম নিতে দিন।
চতুর্থ কাজ হলো জ্ঞান ফিরে আসার পর চিকিৎসকের কাছে যাওয়া। জ্ঞান ফিরে এলেই সব ঠিক হয়ে গেছে ধরে নেবেন না। সেদিনই চিকিৎসকের কাছে যান, ঘটনার বিবরণ দিন।

প্রায় জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন
অজ্ঞান হয়ে যাওয়া হলে খাবারে কী কী এড়িয়ে চলা উচিত?
অজ্ঞান হওয়ার ঘটনার পরপরই খাবার বা পানি দেওয়া ঠিক নয়, বিশেষ করে জ্ঞান পুরোপুরি না ফেরা পর্যন্ত। পরে খাবার নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে চাইলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
অজ্ঞান হয়ে গেলে বারবার হলে কী করবেন?
অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বারবার হলে বিষয়টাকে গুরুত্ব দিয়ে দেখুন। প্রতিটি ঘটনার তারিখ, সময় ও আগের সংকেত লিখে রাখুন, আর দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যান। বারবার অজ্ঞান হওয়া মানেই কোনো একটা কারণ বারবার ঘটছে — কারণটা খুঁজে বের করা জরুরি। একা একা বাইরে বের হওয়া, গাড়ি চালানো বা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ এড়িয়ে চলুন, যতক্ষণ না চিকিৎসক পরামর্শ দেন।
অজ্ঞান হয়ে গেলে কোন টেস্ট/পরীক্ষা লাগতে পারে?
এটা নির্ভর করে ঘটনার ধরন ও চিকিৎসকের সন্দেহের ওপর। চিকিৎসক আপনার ঘটনার বিবরণ শুনে ঠিক করবেন কোন পরীক্ষা দরকার, যেমন হৃদ্যন্ত্র বা স্নায়ু সংক্রান্ত পরীক্ষা। আগেভাগে নিজে থেকে কোনো পরীক্ষা করিয়ে নেওয়ার দরকার নেই — চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এগোন।
অজ্ঞান হয়ে গেলে ঘরে বসে প্রাথমিকভাবে কী করণীয়?
ঘরে বসে প্রাথমিকভাবে যা করবেন তা হলো — অজ্ঞান হওয়া ব্যক্তিকে নিরাপদ জায়গায় শুইয়ে দিন, ভিড় সরিয়ে দিন, গলার কাছে জামা ঢিলে করে দিন, শ্বাস চলছে কিনা খেয়াল রাখুন, আর দেরি না করে ৯৯৯-এ কল করুন। মনে রাখবেন, ঘরোয়া করণীয় জরুরি চিকিৎসার বিকল্প নয় — চিকিৎসকের কাছে যেতেই হবে।
অজ্ঞান হওয়া আর ঘুমিয়ে পড়ার পার্থক্য কী?
ঘুমন্ত ব্যক্তিকে ডাকলে বা নাড়া দিলে সাড়া পাওয়া যায়, আর অজ্ঞান ব্যক্তি ডাকলেও সাড়া দেন না। অজ্ঞান হওয়ার সময় শরীরের পেশি ঢিলে হয়ে যায়, আর ব্যক্তি আশপাশের কিছু বুঝতে পারেন না। কেউ সাড়া না দিলে সেটাকে ঘুম ধরে নিয়ে অপেক্ষা করবেন না — দ্রুত জরুরি সাহায্য ডাকুন।
অজ্ঞান হওয়া ব্যক্তিকে তুলতে গিয়ে কী ভুল করা যাবে না?
অজ্ঞান হওয়া ব্যক্তিকে জোর করে তুলে বসানো, ঝাঁকানো, মুখে পানি বা খাবার দেওয়া, আর গালে চড় মারা — এসবই ভুল। এতে শ্বাসনালিতে খাবার বা পানি চলে যেতে পারে, বা আঘাত লাগতে পারে। সঠিক করণীয় হলো তাকে শুইয়ে রাখা, ভিড় সরিয়ে দেওয়া আর দ্রুত জরুরি সাহায্য ডাকা।
শেষ কথা
অজ্ঞান হয়ে যাওয়া ভয় ধরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা, কিন্তু আতঙ্কিত হয়ে ভুল পদক্ষেপ নেওয়া আরও বিপজ্জনক। দ্রুত জরুরি সাহায্য ডাকা, ব্যক্তিকে নিরাপদ জায়গায় শুইয়ে রাখা, ভুল করণীয় এড়িয়ে চলা এবং জ্ঞান ফিরে আসার পর চিকিৎসকের কাছে যাওয়া — এই চারটি কাজই সবচেয়ে বড় করণীয়। অজ্ঞান হওয়ার ঘটনাকে কখনোই হালকা করে দেখবেন না। সন্দেহ থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
তথ্যসূত্র
- Mayo Clinic — ভ্যাসোভ্যাগাল সিনকোপ, লক্ষণ ও কারণ: https://www.mayoclinic.org/diseases-conditions/vasovagal-syncope/symptoms-causes/syc-20350527
- MedlinePlus — অজ্ঞান হয়ে যাওয়া: https://medlineplus.gov/ency/article/003092.htm